910>|| একদিন হঠাৎ ||
<--আদ্যনাথ-->
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে ইজিচেয়ারে বসে আছি একলা। চারিদিগের পরিবেশ বেশ শান্ত ও চুপ চাপ। মাঝে মাঝে মেট্রো ট্রেন ও লোকাল ট্রেন গুলি হর্ন বাজিয়ে নীরবতা ভঙ্গ করে দেয়।
বর্ষার সময় রেল লাইনে একটু ফাটল দেখা দেওয়ার সেই থেকে এখন মেট্রো ট্রেন গুলি খুব ধীরে যাতায়াত করছে।
বেশ শান্ত ও নিরিবিলি সন্ধ্যা।
আমার বাড়ির দক্ষিণ ও পূর্ব দিক বিস্তীর্ণ অঞ্চল তেমন লোকালয় না থাকার কারণে সারাবৎসর বেশ ঠান্ডা হওয়া পাওয়া যায়।
সেই কারণে সন্ধ্যার পরে আমি ছাদে পায়চারী করতে ও আরাম কেদাড়ায় বসে একটু স্বস্তি পাই। বাড়িতে থাকলে সন্ধ্যা বেলা থেকে রাত্রি নয়টা পর্যন্ত আমার ছাদেই থাকতে ভালো লাগে।
আর শীতকালে সারাটা দুপুরেই ছাদে বসে হেটে সময় কাটাই।
প্রতিদিনের মতন সেদিনও সন্ধেবেলায় আমি ছাদে আরাম কেদাড়ায় বসে ছিলাম,
ঝিলের ঠান্ডা দক্ষিণা হওয়ায় দুচোখ বুঝে আসছিল।
এমন সুন্দর ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ একটু ঘুমের আবেশে চুপ চাপ বসে আছি।
হঠাৎ একঝলক বেশ ঠান্ডা হওয়ায় শরীরটা একটু কেঁপে উঠতেই মনে হলো কেউজেন খানিকটা বরফ ছুড়ে মারলো,
চোখ খুলে গেল , আর তখনই মনেহল আমার সামনে কেউ যেন দাঁড়িয়ে, অবিকল আমার মতন দেখতে।
বেশ একটু ঘাবড়ে গিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে আগন্তুককে জিজ্ঞাসা করলামজ কে কে আপনি?
আগন্তুক একটু মুচকি হেসে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমি ভাবছিলাম যেন আমি নিজে কোন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু আগন্তুক তো দাঁড়িয়ে আর আমি ইজিচেয়ারে বসে।
একটু আরাম করে বসে ছিলাম, হঠাৎ এমন ঘটনায় শিরদাঁড়া সোজা করে বসে দেখছিলাম আগন্তুককে। দেখছিলাম ওনার মুখে সুন্দর মিষ্টি হাসি।
আমি অবাক বিস্ময়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম কে, কে আপনি!
কিন্তু কোন উত্তর পেলাম না।
আর ঠিক তখনি রিও এসে বললো 'দাদু আমার সাইকেল টা বারকরে দেও,আমি সাইকেল চালাবো।'
আমার চমক ভেঙে যেতেই আমার নাতির সাইকেল টা বারকরে দিয়ে ভাবতে লাগলাম ব্যাপারটা কি হল।
হঠাৎ করে লোকটা এলো কোথা থেকে আবার কোথায় চলে গেল!
নাকি সবটাই আমার মনের ভুল।
নাকি আচ্ছন্ন নিদ্রায় সন্ধেবেলায় কোন স্বপ্ন দেখছিলাম।
সেদিনের পরথেকে রোজই ছাদে বসে অপেক্ষা করি সেই আগন্তুকের।
ভাবনাটা কেমন যেন মনে বসেগেছে, কিছুতেই ভুলতে পারছি না।
এমনি করে অপেক্ষায় কেটে গেল অনেক দিন।
কিন্তু তেমন কোন ঘটনাই আর ঘটলো না।
আমিও ভাবতে লাগলাম সেদিন ওটা নিতান্ত আমার মনের ভুল ছিল, আর সেই কারণেই ব্যাপারটা নিয়ে আর কোন ভাবনা চিন্তা করা বন্ধ করে ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলাম।
এর পরে কেটে গেল বহুদিন।
আমি বাড়িতে থাকলেই সন্ধ্যায় নিয়মকরে হাটতাম ছাদে।
বাড়ি থাকলেই হাটতাম এমন কথা বলার একটাই কারন যে আমি বেশিরভাগ দিন তেঘড়িয়ায় মেয়ের বাড়িতে থাকি।
মাঝে মাঝে বাড়িতে আসি। আর বাড়িতে আসলেই নিয়ম করে ছাদে হাটা হাটি করি।
এমনি করেই বেশ কিছুদিন পার হয়েছে।
আর সেদিনও আমি বসে আছি একলা, মাঝে মাঝে একটু পদায়চারী করছি,
আবার বসছি। হাঁটছি আমার মেয়ের কিনে দেওয়া ওয়াক ওয়াচ টা হাতে পরে।
রোজ মাপতে হয় কতটা হাটলাম।
মোবাইলের ব্লুটুথ যোগ করা আছে।
তাই মোবাইল থেকে দেখে নি কতটা হাটলাম কতো ক্যালোরি বার্ন হলো,
ইত্যাদি।
সেদিন বেশ আনমনা হয়েই পায়চারী করছি হঠাৎ পিঠে একঝলক ঠান্ডা হওয়া অনুভব করতেই পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম সেই সেদিনের মতন যেন আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার সমনে আর মুখে সেই মুচকি হাসিটি ঠিক আছে।
আজ কিন্তু একটু বেশ ঘাবড়ে গিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করলাম কিন্তু মুখদিয়ে কোন আওয়াজই বার হলো না।
এবার মনে হচ্ছিলো কপালে একটু একটু ঘাম জমছিল, সঙ্গে কোন রুমাল ছিলোনা তাই হাতদিয়েই ঘাম মোছার চেষ্টা কোরতেই আগন্তুক বলে উঠলো " কি ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন, কি নিজেকে চিনতে পারছো না? আমি তো তোমারই আত্মা। অশরীরী হয়ে আসলে বা অন্য কোন শরীরে ভর করে আসলে হয়তো ভয় পেতে, জানি তুমি ভয় পাওনা, অনেক অশরীরী আত্মার সাথে বহুবার তোমার কথা হয়েছে, সে তো বহু দিনের কথা, আজ আমি এসেছি তোমার কথা শুনতে নয় , তোমাকে কিছু বলতে।
আমি মনে মনে একটু সাহস জুগিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম , কি এমন কথা জানতে এমন ভাবে আমার সন্মুখে?
আমি কথা গুলি বলে ভাবতে লাগলাম সত্যিকি আমি কিছু বলতে পারলাম, নাকি শুধু মনে মনে ভাবলাম । কিছূই বুঝে উঠতে পারলাম না।
আগন্তুক সেই আগের মতন একটু মুচকি হেসে বললো "আজ তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আজ তুমি শুধু শুনে যাও আর বলো তুমি কেন বার বার নিজের মৃত্যুর চিন্তা করো? মৃত্যুর কথা লেখ?
তুমিকি জানো, মৃত্যুর পরে জীবের অশরীরী শরীরটিকে কতো কষ্ট সহ্য করতে হয়!
মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে জায়না,
মৃত্যুর পরেও চলতে থাকে প্রকৃতির নানান বিবর্তন যাকে তোমরা বলো যমালয়ে যমের বিচার। মৃত্যুর পরে আবার নুতন জীবন না পাওয়া পর্যন্ত অশরীরী শরীরটিকে সইতে হয় অবিরাম অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট, নানা প্রকার নির্যাতন।
যে কষ্টের কথা জানলে কোন মানুষই সুস্থ থাকতে পারবে না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে সকলকে তো একদিন না একদিন মরতে
হবেই।
জেনে রাখ বেঁচে থাকাই সুখের, আনন্দের,
যত ইচ্ছা সুখ ভোগ করে নেও জীবন থাকতে।
মৃত্যু পরে চলতে থাকে প্রকৃতির অসহনিয় ভীষণ কষ্ট দায়ক না না বিবর্তনের জ্বালা
যন্ত্রনা।
এক মাত্র শুদ্ধ আত্মার শুদ্ধ শরীরের মুক্তি হয়। তাকে আর জন্ম মৃত্যুর চক্র ভোগ করতে হয় না। তাকে আর কোন শরীরে ঠাঁই নিতে হয়না। সে মুক্ত।
শুদ্ধ আত্মার শুদ্ধ শক্তি প্রকৃতির শক্তির সাথে মিলে যায়।সেই শক্তির রূপান্তর হয়।
আর বাকি সকলকে আবার ভোগ করতে হয় নুতন যোনিতে নুতন শরীরে।"
এতক্ষন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একদৃষ্টি তে চেয়ে।
এবার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেল।
আমি সন্ধ্যার আকাশে তাকিয়ে রইলাম অবাক বিস্ময়ে।
এমন ঘটনার কারন বুজতে আমার সময় লাগলো না, বুঝতে পারলাম আমি যে
লিখেছিলাম আমার মৃত্যু নিয়ে কিছু কথা।
আর সেই কারণেই এমন ঘটনা।
বুঝলাম এমনিকরেই চলে জীবনের খেলা।
বেঁচে থাকাটাই আনন্দের সুখের।
মৃত্যুই অন্ধকার বড় নৃশংস,ক্রূর, নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর কঠিন হাহা কার,
যেখানে নাই কোন প্রতিকার,
আছে শুধু ভয়ঙ্কর হাহা কার।
<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
===========================